সামনে অনিশ্চিত পথ বিশ্ব অর্থনীতির

0

চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না, হচ্ছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ সংকোচন। কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় এটি অপ্রত্যাশিত না হলেও শিগগিরই বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আগামী বছর প্রায় সবাই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে তা ঠিক, কিন্তু প্রাক্-কোভিড পর্যায়ে ফিরতে বেশ সময় লেগে যাবে বলেই ধারণা আইএমএফের। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এ কথা বলেছে তারা।

কোভিডের বয়স প্রায় এক বছর হতে চলল, কিন্তু এর বিস্তার কবে থামবে, তা এখনো কেউ হলফ করে বলতে পারে না। প্রায় সব দেশই লকডাউন তুলে নিয়ে স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে। কিন্তু কর্মসংস্থান প্রাক্-কোভিড পর্যায়ে ফিরে যায়নি। দেখা যাচ্ছে, নিম্ন আয়ের মানুষ, তরুণ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দারিদ্র্য বিমোচনে পৃথিবী যে সফলতা অর্জন করেছিল, তা-ও হুমকির মুখে পড়েছে। এ বছর প্রায় ৯ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ।

সে জন্যই আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ বলেছেন, দুঃখের দিন দীর্ঘ হবে। উত্তরণের পথ আবার মসৃণ হবে না, নানা খানাখন্দে ভরা থাকবে তা। অনিশ্চয়তা থাকবে তুঙ্গে। তাঁদের পরামর্শ, এই পরিস্থিতিতে হুট করে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিগত সহায়তা তুলে নেওয়া ঠিক হবে না।

২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে। এরপর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা গতি হারিয়ে মধ্য মেয়াদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে থিতু হবে বলে জানাচ্ছে আইএমএফ। ফলে ২০২০-২৫ সালের অর্থনৈতিক তৎপরতা নিয়ে মহামারির আগে আইএমএফ যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, বিশ্ব অর্থনীতি সেই পথে তেমন একটা অগ্রসর হতে পারবে না। এতে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন থমকে যাবে। আইএমএফ বলছে, জীবনমানের উন্নয়নের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। এতে অবধারিতভাবে বৈষম্য বাড়বে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অভাবে নিম্ন আয়ের ও অরক্ষিত মানুষেরা আরও অরক্ষিত হয়ে পড়বে। পাশাপাশি এই মহামারির কারণে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষের আয়বৈষম্য আরও বাড়বে। আইএমএফ বলছে, ২০২১ সালে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর (চীন ছাড়া) প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি উন্নত দেশের তুলনায় কম হবে।

অন্যদিকে শ্রমবাজারের অবস্থাও ভালো নয়। যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সারতে সময় লেগে যাবে। অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। পাশাপাশি ডিজিটাল যন্ত্রের অভাবে গরিব দেশের গরিব মানুষের সন্তানেরা পড়াশোনায় পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে মানবসম্পদ তৈরি ব্যাহত হবে।

সবকিছু নির্ভর করছে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের ওপর। আইএমএফ বলছে, সামাজিক দূরত্বের নিয়ম ২০২১ সাল পর্যন্ত জারি থাকবে। তবে টিকা এলে এবং চিকিৎসা আরও উন্নত হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা কমবে।

অন্যদিকে শুধু কোভিডজনিত মন্দাই নয়, কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কারণেও অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়বে। অধিকাংশ দেশই প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারবে না। যেসব কারণে মহামারির আগে উৎপাদন কমেছে, মহামারি এসে সেগুলো আরও প্রকট করে তুলবে—বিনিয়োগের স্বল্পতা, মানবসম্পদের অপ্রতুল উন্নয়ন ও প্রযুক্তির স্বল্প প্রয়োগ।

আগেও বলা হয়েছে, এখন মহামারির গতি-প্রকৃতির ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে। প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক তৎপরতা নির্ভর করছে ভাইরাসের প্রকোপের ওপর। এই প্রতিবেদন লেখার সময়ই জানা গেল, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মাত্রায় লকডাউন আরোপ করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে জনস্বাস্থ্যই এখন প্রধান উদ্বেগর বিষয়।

দ্বিতীয়ত, মহামারিতে মানুষের আয় কমার কারণে চাহিদা কমে যায়। এমনকি আয় না কমলেও মানুষ খরচের ব্যাপারে সাবধানী হয়ে ওঠে। সামগ্রিকভাবে চাহিদা অনেকটাই পড়ে যায়। এই সময় মানুষ সাধারণত বেড়াতে যেতে চায় না, তাই পর্যটন খাত ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে।

তৃতীয়ত, মহামারির মধ্যে আর্থিক খাতের মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চাহিদা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহ ব্যাহত হয়। বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহ দেখান না।

মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় সারা বিশ্বে ১২ লাখ কোটি ডলারের সহায়তা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর সঙ্গে আরও নানা ধরনের মুদ্রা ও রাজস্ব নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে—নীতি সুদহার হ্রাস, তারল্য বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্পদ ক্রয় প্রভৃতি। এতে বহু মানুষের জীবন বেঁচেছে বলে মনে করে আইএমএফ।

আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ বলেন, পুনরুদ্ধারের পালে হাওয়া লাগাতে আরও অনেক কিছু করতে হবে। প্রথমত, এই স্বাস্থ্য সংকটের ইতি টানতে আন্তর্জাতিক পরিসরে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পরীক্ষা, চিকিৎসা ও টিকা উৎপাদনে প্রভূত উন্নতি হয়েছে; কিন্তু সব দেশ একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল যথেষ্ট পরিমাণে টিকা উৎপাদন ও বিপণন করা যাবে। আইএমএফের প্রাক্কলন, চিকিৎসা যদি দ্রুততার সঙ্গে লভ্য করা যায়, তাহলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক আয় ৯ লাখ কোটি ডলার বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার একটি মূল্য আছে—ব্যক্তি মানুষকে সেটা দিতে হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির নানা সূচকে বাংলাদেশ ভালোই করছে, কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষকে নানা ছাড় দিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। অনেকের চাকরি গেছে, আয় কমেছে; অনেকে আবার শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে—এসব কিছুর বিনিময়ে এই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে পথটা সহজ নয়।

বৈশ্বিক পুনরুদ্ধার সম্পর্কে সেলিম রায়হান বলেন, এই পুনরুদ্ধার অনেকগুলো শর্তের ওপর নির্ভর করছে। কোভিডের দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হয়েছে। তবে এখন বিশ্বের সামনে অভিজ্ঞতা আছে। এতে এই ধাক্কা সামলানো সহজ হবে বলেই তিনি মনে করেন। টিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিকা উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়, এর যেন ন্যায্য বণ্টন হয়, উন্নয়নশীল দেশের গরিব মানুষও যেন এই টিকা পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর কোভিড-১৯-কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেব অভিহিত করেছে আইএমএফ। এটি সামলাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক নীতিগত পদক্ষেপ দরকার বলে মনে করে তারা।

Share.

About Author

Leave A Reply

hioidind