ফিরেছে গতি চাঙ্গা অর্থনীতি

0

আবাসন খাতে প্রাণ ফিরে আসায় গতি ফিরেছে অর্থনীতিতে। প্লট ও ফ্ল্যাটের বুকিং বাড়ার কারণে এর সঙ্গে যুক্ত ৪৬০টি শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এ খাতে সহজ শর্তে কালো টাকা বিনিয়োগ সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। ফলে বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। অবিশ্বাস্যভাবে বাড়ছে প্রবাসী ও রপ্তানি আয়, যা অর্থনীতিতে এক ধরনের গতির সঞ্চার করছে। পাশাপাশি নতুন নতুন রপ্তানি আদেশ পাচ্ছে পোশাক খাত। বাড়তে শুরু করেছে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির অন্য খাতগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাড়তে শুরু করেছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধিও। এডিবি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডসহ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধার হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশই অর্জিত হবে।

জানা গেছে, কভিড-১৯ মহামারীর কারণে গত মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় সারা দেশে চলমান নির্মাণ খাতের প্রকল্প বা সাইটগুলোর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। স্থবির হয়ে পড়ে সার্বিক অর্থনীতি। বর্তমানে কভিডের আতঙ্ক কেটে যাওয়ায় এসব সাইটের কাজ আবারও শুরু হয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ সামগ্রীর বাজারে চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। নির্মাণ খাতের কাঁচামালের উৎপাদন ও বিপণন আবারও শুরু হয়েছে প্রায় পুরোদমে। এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকাও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বের অনেক দেশই এখনো ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও বাংলাদেশ এই সংকটকে খুব ভালোভাবেই সামাল দিতে পেরেছে বলে মনে করে এডিবি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ খাতগুলোর উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় তেমন কোনো বড় ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারেনি কভিড-১৯। যে কারণে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রধানতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। তবে কর্মসংস্থানের জায়গায় কিছুটা সংকট রয়েছে। কেননা পুঁজির নিশ্চয়তা, বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ আর আস্থাহীনতা রয়ে গেছে কিছুটা। নতুন করে শিল্প স্থাপনে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি সরকারি খাতেও কর্মসংস্থানের চাকা ঘুরছে ধীরগতিতে। এর বাইরে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরে এসেছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে প্রবাসী আয়।

রপ্তানি আয়েও সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। আমদানি ব্যয় কম থাকায় ও রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। মূল্যস্ফীতির চাপও মোটামুটি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবশ্য বন্যার প্রভাব কেটে গেলে শাক-সবজিসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বাড়লে পণ্যমূল্য কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাকে সঙ্গী করেই সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। প্রবাসী ও রপ্তানি আয় বাড়ছে। এমনকি কৃষি খাতও ধাক্কা সামলে নিয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে জড়িতরা এখনো লড়াই করছেন। যারা নিঃস্ব হয়ে গেছেন তাদের পাশে দাঁড়ানো খুব জরুরি। কেননা সরকারের প্রণোদনা সুবিধাও তারা ঠিকমতো পাচ্ছেন না।

জানা গেছে, সামষ্টিক অর্থনীতির বেশকিছু সূচক প্রতিনিয়তই ভালো করছে। অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে প্রবাসী আয়ে। নতুন নতুন রপ্তানি আদেশ পাচ্ছে পোশাক খাত। খুলেছে কলকারখানা। উৎপাদনে গতি বেড়েছে। আর কৃষি খাত তো বন্ধ হয়নি কখনই। সব মিলিয়ে কভিড-১৯-কে সঙ্গী করেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র চীন ছাড়া বাকি সব দেশই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে। সেখানেও বাংলাদেশে বেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। যদিও তা সরকারের কাক্সিক্ষত হারের চেয়ে অনেক কম। এক্ষেত্রে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ দারুণভাবে কাজ করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তা, কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট, এসএমই শিল্পের উদ্যোক্তারা সেই প্রণোদনার সুবিধা পাচ্ছেন। তবে একেবারেই প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে জড়িতরা এই প্রণোদনার সুবিধা কাক্সিক্ষত হারে পাচ্ছেন না। যার ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতে জড়িত ২১১টি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্প খাত রয়েছে। আর ১৮ খাতে বিভক্ত পণ্যভিত্তিক উপ-খাত হলো ৪৬০টি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো- রড, সিমেন্ট, রেডিমিক্স, ইট, পাথরসহ ১১টি উপ-খাত নিয়ে সিভিল খাত। ক্যাবল, সার্কিট ব্রেকার, সুইচ-সকেট, মিটার, লাইট মিলিয়ে ৩০টি উপ-খাতের ইলেকট্রিক খাত। উড, দরজা, লকসহ ২৫টি উপ-খাত নিয়ে উড খাত। পাইপ, গ্লাস, ট্যাব, ফিটিংস, ওয়াটার পাম্প নিয়ে ২০টি উপ-খাতের প্লাম্বিং খাত। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রকারের টাইলস, মার্বেল, স্টোন, মোজাইক চিপস ইত্যাদি ১৩টি উপ-খাত নিয়ে টাইলস খাত। কমোড, বেসিন, বাথট্যাব, হ্যান্ড শাওয়ার, কানেকশন পাইপ, গ্রেটিংসহ ৩৩টি উপ-খাত নিয়ে স্যানিটারি খাত। পেইন্ট, ফোম ল্যাব, বুন্স অ্যান্ড পোলিশ নিয়ে ছয়টি উপ-খাতের পেইন্ট খাত। সুরকি, কেমিক্যাল, এডমিক্সার, স্টোনসহ ছয়টি উপ-খাত। ফ্লোর ব্রোম, হেয়ার ব্রুশ, সেফটি নেট, রয়েল প্লাগ, প্লামব্রুশ, হস পাইপ, প্যাড লক, মাসকিন ট্যাব ইত্যাদি ৯৭টি উপ-খাত নিয়ে হার্ডওয়্যার খাত। লিফট, সাব-স্টেশন, সোলার সিস্টেম, জেনারেটর, ইন্টারকমসহ ১৮টি উপ-খাতের ইলেকট্রিক খাত। অ্যালুমিনিয়াম, গ্রিল, ফায়ার ডোর, স্টিল অবকাঠামো, স্কাই লাইট, এলপিজি সিস্টেম, সুইমিং পুল ইত্যাদি নিয়ে ৬৪টি উপ-খাতের সাব-কন্ট্রাক্ট খাত। এক্সসাভেটোর, লিফট ট্রাক, রোড রোলার মেশিন, বুলডোজার, ডাম্প ট্রাকস, পাইপ ড্রাইভিং মেশিনসহ ১৯টি উপ-খাতের কনস্ট্রাকশন মেশিনারিজ খাত। সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, স্যানিটারি, টাইলস, পেইন্ট, সয়েল টেস্ট, পাইল ওয়ার্ক নিয়ে ২৬টি উপ-খাতের শ্রম খাত। এ ছাড়াও ভূমি উন্নয়ন, প্রশাসনিক, হোম অ্যাপ্লিক্যান্স ও অফিস স্টেশনারি খাতে আরও ৯০টি উপ-খাত জড়িত রয়েছে আবাসনশিল্পের সঙ্গে। করোনার ভীতি কেটে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। যার ফলে এসব খাত আবারও প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের আগে থেকেই একটি বাদে বাকি প্রায় সব সূচকই ছিল নিম্নমুখী। রপ্তানি আয়ে কোনো প্রবৃদ্ধি ছিল না, আমদানিতেও ছিল একই অবস্থা। রাজস্ব আয়ে ছিল বড় ঘাটতি। আয় কম থাকায় সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়ছিল। বেসরকারি বিনিয়োগ অনেক আগে থেকেই ছিল স্থবির। এরই মধ্যে শুরু হয় করোনা মহামারীর সংকট, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। বিশ্বব্যাপী শুরু হয় মানুষের বাঁচা-মরার লড়াই। এই আতঙ্ক আর সংকটকে সঙ্গী করেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বছরের প্রথম দিকে রপ্তানি খাত ধসে পড়লেও তিন মাসের ব্যবধানেই ধাক্কা সামলে আবার গতি ফিরে পেয়েছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আমদানির সূচক অবশ্য এখনো খুব আশাব্যঞ্জক না হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন নতুন বিনিয়োগ শুরু হলেই আমদানি খাতও চাঙ্গা হবে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের ওপর নগদ ২ শতাংশ প্রণোদনা কার্যকর হওয়ায় প্রবাসী আয়ে অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি চলমান রয়েছে। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধিও বাড়তে শুরু করেছে, যা আবারও নতুন করে আশার সঞ্চার করছে বিনিয়োগ খাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা গত বছরের আগস্টের চেয়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। আগের মাস জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। ফলে এই চিত্র বলে দেয় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি বাড়ছে, যা মূলত বিনিয়োগ বৃদ্ধির নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কভিড-১৯-এর প্রভাবে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যস্ত ছিল। এখন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। প্রত্যেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে সবকিছু স্বাভাবিক হতে এবং অর্থনীতিকে আগের অবস্থানে নিয়ে যেতে আরও সময়ের প্রয়োজন হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষ কাজে ফিরে এসেছে। শিল্প ও কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ছে। কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে সব ধরনের অর্থনৈতিক খাতে। ফলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতি।

Share.

About Author

Leave A Reply

hioidind